Home / All Categorized / রেলের শহর পার্বতীপুর, দিনাজপুর

রেলের শহর পার্বতীপুর, দিনাজপুর


দিনাজপুর জেলার পার্বতীপুর অবিভক্ত ভারতের রেলওয়ের ইতিহাসে এক অবিচ্ছেদ্য নাম। আর বর্তমান বাংলাদেশেও এটি কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। কেননা ব্রড গেজ ও মিটার গেজের সংমিশ্রণে বাংলাদেশে একটি মাত্র চার লাইনের রেল জংশন রয়েছে, তা হলো পার্বতীপুর। ট্রেনের প্রতি কিংবা রেলের প্রতি যাদের ভালোবাসা রয়েছে, রেলের আদি ঘ্রাণ নিতে হলে একবার পার্বতীপুর জংশন ঘুরে আসতেই হবে। সেখানের লাল ইটের রেল কলোনি, সুশোভিত ছায়ানিবিড় প্রাচীন বৃক্ষরাজি মুগ্ধতার সঙ্গে দেবে শীতল ছায়া ও শান্তির ছোঁয়া।

শৈশব-কৈশোরে এই শহরটাই আত্মার সঙ্গে মিশে গিয়েছিল, আর এখন যেটা হয়, সেটা ফেরা নয় ‘বেড়াতে যাওয়া’। ব্রিটিশ সময়কালে উপমহাদেশে রেললাইন স্থাপনের চিন্তার প্রাথমিক পর্যায়েই যুক্ত হয়ে যায় পার্বতীপুরের নাম। কেননা ব্রিটিশ রাজধানী কলকাতার রেল রুটের সঙ্গে বাংলাদেশের আর যে ক’টি রেলস্টেশনের নাম উল্লেখ ছিল, তার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে ছিল পার্বতীপুর। কলকাতা থেকে শিলিগুড়ি রেলপথ স্থাপনের জন্য বর্তমান বাংলাদেশের দর্শনা, সান্তাহার, পার্বতীপুর ও চিলাহাটিকে সংযোগ করা হয়। ১৮৭৬ সালে কলকাতা থেকে পার্বতীপুর হয়ে সরাসরি শিলিগুড়ি যাওয়া যেত। পরবর্তীতে ভারতের কোচবিহারের সঙ্গে রেলসংযোগ স্থাপনের জন্য পার্বতীপুরকে বেছে নেয়া হয়। নর্থ বেঙ্গল স্টেট রেলওয়ের আওতায় মাত্র তিন বছরের মধ্যেই ১৮৭৯ সালে পার্বতীপুর থেকে কাউনিয়া পর্যন্ত এবং বুড়িমারী-চেংরাবান্ধা রেল স্থাপনের মাধ্যমে পার্বতীপুর স্টেশন থেকে পার্বতীপুর জংশনে রূপান্তরিত হয়।

তখন ব্রিটিশদের কাছে ভারতীয় উপমহাদেশে পার্বতীপুরের গুরুত্ব ছিল অনেক বেশি। আর এ কারণে বিহারের সঙ্গে পার্বতীপুরের সরাসরি রেল যোগাযোগ স্থাপনের উদ্যোগ নেয়া হয়। আসাম বিহার স্টেট রেলওয়ের আওতায় ১৮৮৪ সালে বিহারের কাটিহার-পার্বতীপুর রেলপথ সংযুক্ত হয়। ভারত থেকে বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ একটা অংশ হারিয়ে ফেলে। তাই বলে পার্বতীপুরের গুরুত্ব কমেনি। বর্তমান বাংলাদেশেও পার্বতীপুর জংশনের গুরুত্ব অনেক বেশি।

পার্বতীপুর জংশনে প্লাটফর্ম আছে পাঁচটি। প্রায় সময়েই স্টেশনে ট্রেন গমগম করে। বর্তমানে সারা দিনে ৫২টি ট্রেন যাতায়াত করে। এছাড়া বেশকিছু ট্রেন বন্ধ-কিংবা চালু হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে। গোটা বাংলাদেশের বড় রেলস্টেশনগুলো আধুনিকায়ন হলেও পার্বতীপুর স্টেশনের আধুনিকায়ন করা হয়নি। আর এটাই হচ্ছে বেড়ানোর মানুষের জন্য মজার, কেননা সেই ব্রিটিশ ফ্লেভার এনে দেবে লাল ইটের পুরনো জংশন…।

পুরো প্লাটফর্মকে অতিক্রম করার জন্য রয়েছে একটি রেল ওভারব্রিজ। লোহার এই ব্রিজে আমাদের শৈশব-কৈশোরের অনেকটা সময় কেটেছে। ব্রিজের ওপর দাঁড়ালে স্টেশনের পুরো দৃশ্য দেখা যায়। সবসময় ব্রিজের ওপর পাওয়া যায় প্রচণ্ড বাতাস। স্টেশনের ওপরেই রয়েছে একটি আধুনিক সুইচ কেবিন। এখান থেকে পুরো জংশনের ট্রেনের গতিপথ নির্ধারণ করা হয়। কোন ট্রেন কোন লাইনে যাবে, তা নির্ধারণ করার সঙ্গে সঙ্গে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সে লাইনে আগত ট্রেনকে নিয়ে আসা হয়। তিনতলা এই সুইচ কেবিনের কার্যক্রমও দেখার মতো এবং সঞ্চিত হবে নতুন অভিজ্ঞতা।

বাংলাদেশে চারটি লোকোমোটিভ (রেল ইঞ্জিন) কারখানা রয়েছে। এর মধ্যে প্রধান লোকোমোটিভ কারখানাই হলো পার্বতীপুরে, যার নাম কেন্দ্রীয় লোকোমোটিভ কারখানা (কেলোকা)। পার্বতীপুর রেলস্টেশন এলাকা থেকে এটি খুব বেশি দূরে নয়। রিকশা ভ্যানে ভাড়া নেবে ১০ টাকা। এটা রেলের ইঞ্জিন তৈরির কারখানা হলেও মেয়াদোত্তীর্ণ ইঞ্জিনকে নতুনভাবে মেরামত করে মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। পার্বতীপুর কেন্দ্রীয় লোকোমোটিভ কারখানায় বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশলের শিক্ষার্থীরা আসেন সরেজমিন ক্রিয়া দর্শন করতে, এছাড়া পলিটেকনিকের শিক্ষার্থীরা সরেজমিন প্রশিক্ষণ নিয়ে থাকেন। এখানে প্রবেশাধিকার সীমিত, তাই যাওয়ার আগে রেল কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিতে হবে।

পার্বতীপুরে লোকোশেড, ডিজেল শেড রয়েছে, যা রেলের প্রতি আগ্রহের বড় ধরনের খোরাক জোগাবে। স্টেশন এলাকার পেছন দিকেই রয়েছে সাহেবপাড়া, বাবুপাড়া। এখানে রেলের সাহেব বাবুরা থাকতেন। এখনো বড় কর্তারা এখানে বসবাস করেন। এই এলাকার রেল কোয়ার্টারগুলোর স্থাপত্য চোখ জুড়াবে।

ব্রিটিশ সময়কালে বহু খ্যাতনামা ব্যক্তির পা পড়েছে এ পার্বতীপুরে। অনেকেই এসেছেন রেলের চাকরিসূত্রে, পরে মায়ায় পড়ে আর ফেরেননি। পার্বতীপুর স্টেশনে চাকরি করেছেন বিশ্বখ্যাত ফুটবলার জাদুকর সামাদ। তার জন্য একটি বিশেষ পদ সৃষ্টি করে ব্রিটিশ রেল কর্তৃপক্ষ। প্লাটফর্ম সুপারভাইজার হিসেবে তিনি দায়িত্ব পালন করেন। এই ফুটবলের জাদুকরের সমাধিসৌধ রয়েছে পার্বতীপুরের ইসলামপুর এলাকায়। উপমহাদেশের ফুটবলে এখন পর্যন্ত সামাদ ছাড়া আর কাউকে ‘ফুটবলের জাদুকর’ বলা হয়নি। ফুটবলের আড্ডায় উপমহাদেশের প্রসঙ্গ উঠলে সামাদের কথা উঠবেই। ১৯৩৬ সালে তিনি ভারতীয় দলের অধিনায়কের দায়িত্ব পালন করেন। বিদেশের মাটিতে তার খেলা দর্শকদের নজর কেড়েছে। তার নামে স্টেশন এলাকার পাশেই রয়েছে একটি মিলনায়তন।

ঢাকা থেকে পার্বতীপুরগামী একাধিক ট্রেন রয়েছে। সকালে নীলসাগর এক্সপ্রেস ও একতা এক্সপ্রেস কমলাপুর স্টেশন থেকে ছেড়ে যায়। রাতে যায় দ্রুতযান এক্সপ্রেস। সবগুলো ট্রেনেই শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষ ও স্লিপিং কক্ষ রয়েছে। রেলের শহরে বাসেও যাওয়া যায়। ঢাকার কলেজগেট থেকে হক এন্টারপ্রাইজের বাস ছাড়াও হানিফ, নাবিল ও কয়েকটি কোম্পানির বাস ছেড়ে যায়। থাকার জন্য তেমন কোনো ভালো হোটেল নেই। তবে ববি আবাসিক হোটেল, হোটেল ডিলাক্স, লাকি বোর্ডিংসহ অন্তত পাঁচটি হোটেল রয়েছে। তবে উত্তর-পশ্চিম মত্স্য সম্প্রসারণ প্রকল্পের (হ্যাচারি) ডরমিটরিতেও অনেকে অতিথি হিসেবে থাকার সুযোগ পান।

লেখা: মাহতাব হোসেন

Facebook Comments
Share This Post

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

শোলাকিয়াকে ছাড়িয়ে প্রথম বারের মতো দিনাজপুরে অনুষ্ঠিত হলো ‘উপমহাদেশের সর্ববৃহত্তম’ ঈদ জামাত!

প্রায় আড়াই লক্ষাধিক মুসল্লির সমাগমে দিনাজপুরে অনুষ্ঠিত হলো উপমহাদেশের সর্ববৃহত্তম ঈদের জামাত। দিনাজপুরের গোর-এ-শহীদ বড় ...